সংবিধানের সংশোধনী : বাংলাদেশের সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৫ বার সংশোধনী আনা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। সংবিধান সংশোধনের জন্য ৭ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে অনুমোদন দিতে হয়। সংবিধানের ১৪২ ধারা বলে এই সব সংশোধনীসমূহ আনা হয়েছে।

পঞ্চদশ সংশোধনী – এক নজরে
জাতীয় চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এলn
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল, অন্যান্য ধর্মের সমমর্যাদা নিশ্চিত করার বিধানn
সাতই মার্চের ভাষণ, ছাব্বিশে মার্চের ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্তn
অবৈধ ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তি
সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি
জাতির পিতার স্বীকৃতি

বিলে গুরুত্বপূর্ণ যা যা এসেছে
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ :
বিলের ২০ ও ২১ নম্বর প্রস্তাবনায় বলা হয়, সংবিধানের ৫৮(ক) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হইবে। সংবিধানের ২(ক) পরিচ্ছেদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হইবে। প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পদসংক্রান্ত ১৫২ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও ক্রান্তিকালীন এবং অস্থায়ী বিধানাবলী সংক্রান্ত ১৫০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নব্বই দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন : সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব রেখে বিলে বলা হয়, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে’ প্রতিস্থাপিত হবে।

স্বাধীনতার ঘোষণা :
পাস হওয়া বিলে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বাংলাদেশের ঘোষণা অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। বলা হয় ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা।’ ঘোষণাটি হলো —‘ইহাই হয়তো আমার শেষবার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ :
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ওই [বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান] ভাষণ এবং এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়ার নির্দেশনা তথা ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া টেলিগ্রাম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে বিলে সুপারিশ রয়েছে। মুজিবনগর সরকারের ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও পাস হওয়া বিলে রয়েছে।

চার মূলনীতি পুনর্বহাল :
বিলে ’৭২-এর মূল সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন অনুচ্ছেদ ৬(২) প্রতিস্থাপনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে বিলে প্রস্তাব করা হয়, ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ প্রথম অনুচ্ছেদে প্রস্তাবনায় ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন হবে।

মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্র :
একইসঙ্গে বিলে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণ এবং সপ্তম তফসিলে ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

বিসমিল্লাহ বহাল, তবে :
বিলটি সংবিধানের প্রারম্ভে, প্রস্তাবনার ওপরে ‘বিসিমল্লাহির-রহ্মানির-রহিম’ বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংবিধানে আগে এর বাংলা অনুবাদ ছিল- ‘দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে।’ তবে, এক্ষেত্রে ‘পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’ কথাটিও যুক্ত হবে।
রাষ্ট্রধর্ম বহাল : অনুচ্ছেদ ২(ক) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র্রধর্ম ইসলাম থাকছে। বলা হয়েছে- ‘তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সম-মর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ এছাড়া ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিধান বহাল রাখার কথা রয়েছে।

জাতির পিতার প্রতিকৃতি :
বিলে অনুচ্ছেদ ৪-এর শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘জাতির পিতা’। বলা হয়, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সব সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে।’

মৌলিক বিধান সংশোধন অযোগ্য :
ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতায় এসে যেন এই অনুচ্ছেদে সংশোধন-পরিবর্তন না আনতে পারে সেজন্য অনুচ্ছেদ ৭(ক)-এর পর নতুন অনুচ্ছেদ ৭(খ) যোগ করার প্রস্তাব দিয়ে বিলে বলা হয়েছে— “এ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহাই কিছু থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথমভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম ক-ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০-সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।”

অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলকারীদের সর্বোচ্চ দণ্ড :
বিলে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার এবং শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৭-এর (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকে অপরাধ বিবেচনায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, অপরাধে দোষী ব্যক্তি সংসদের আইন দ্বারা অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা নির্বাচনে অযোগ্য :
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতা সংক্রান্ত ১২২ অনুচ্ছেদের দফা ২-এর উপদফা (গ) ও (ঘ)-এর পরিবর্তে উপ-দফা (গ) (ঘ) ও (ঙ) প্রতিস্থাপনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে ‘তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত না হইয়া থাকেন’। অর্থাত্ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কেউ দণ্ডিত হলে তিনি ভোটার হওয়ার অযোগ্য হবেন। এর ফলে ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত হবেন তাদের ভোটাধিকার থাকবে না। এতে তারা আগামীতে নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবেন না।

সংরক্ষিত মহিলা আসন :
উত্থাপিত বিলে অনুচ্ছেদ ৬৫-এ সংশোধনী এনে সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬৫ অনুচ্ছেদে নতুন করে ৩(ক) দফা সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে বিলে বলা হয়, ‘৩(ক) সংবিধান (পঞ্চদশ) আইন, ২০১১ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদে এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তিনশত সদস্য এবং (৩) দফায় বর্ণিত পঞ্চাশ মহিলা-সদস্য লইয়া সংসদ গঠিত হইবে।’ এক্ষেত্রে চলতি সংসদেই নারী আসন পাঁচটি বৃদ্ধি পাবে।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল :
সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ও বিচারকের ন্যায় অপসারণযোগ্য পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের অপসারণ পদ্ধতি সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ৯৬-এ সামান্য সংশোধনী আনা হয়েছে। বলা হয়েছে— ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারকের মধ্যে পরবর্তী যে দুইজন কর্মে প্রবীণ তাঁহাদের লইয়া গঠিত হইবে।’ কাউন্সিলের তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট বিচারককে অপসারণ করতে পারবেন।


আদিবাসী প্রসঙ্গ ও নির্বাচন কমিশন : আদিবাসী সংশোধনী বিলে বলা হয়েছে, উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশ নামে ২৩(ক) নতুন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হবে। বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নির্বাচন কমিশনে সদস্য সংখ্যা ৫ করার বিধান করা হয়েছে।
নির্বাচনের বিষয়ে অনুচ্ছেদ ১২৫এ (গ) দফা সংযোজিত হবে— “কোন আদালত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হইয়াছে এইরূপ, কোন নির্বাচনের বিষয়, নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসঙ্গত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ প্রদান না করিয়া, অন্তর্বর্তী বা কোনরূপে আদেশ বা নির্দেশ প্রদান করিবেন না।”

ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ :
অনুচ্ছেদ ১৮-এর পর নতুন অনুচ্ছেদ ১৮ (ক) করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বিলটিতে। নতুন অনুচ্ছেদ ২৩ (ক) সংযোজন করে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের প্রস্তাবও করা হয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯-এ সংশোধনীর প্রস্তাব এনে বিলে বলা হয়েছে ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সঙ্কল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’

এছাড়া ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফার (ক) উপ-দফায় সংশোধন এনে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহবানের বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৮০ সংশোধন করে সংসদে পাস হওয়া বিলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে শিথিলতা আনা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে— ‘রাষ্ট্রপতির নিকট কোন বিল পেশ করিবার পর পনের দিনের মধ্যে তিনি তাহাতে সম্মতি দান করিবেন কিংবা অর্থ বিল ব্যতীত অন্য কোন বিলের ক্ষেত্রে বিলটি বা তাহার কোন বিশেষ বিধান পুনর্বিবেচনার কিংবা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্দেশিত কোন সংশোধনী বিবেচনার অনুরোধ জ্ঞাপন করিয়া একটি বার্তাসহ তিনি বিলটি সংসদে ফেরত দিতে পারিবেন; এবং রাষ্ট্রপতি তাহা করিতে অসমর্থ হইলে উক্ত মেয়াদের অবসানে তিনি বিলটিতে সম্মতিদান করিয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে”।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে :
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধানের বিভিন্ন বিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনয়নের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভা কর্তৃক চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১-এর বিলে কতিপয় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে মূলত ১৯৭২ সালের সংবিধানের মোৗলিক বৈশিষ্ট্য, জনগণের মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি ইত্যাদি সংক্রান্ত বিধান পুনর্বহালের প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করা লক্ষ্যে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা গ্রহণ এবং এ অপব্যবহারক্রমে দেশে আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার পরাহত করার প্রচেষ্টা বন্ধের লক্ষ্যে এধরনের পদক্ষেপকে অপরাধগণ্যে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, উস্কানিদাতা ও সহযোগীদেরকে শাস্তি প্রদানের বিধান বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনে জনগণের রায় প্রতিফলিত হওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর উদ্যোগ যেভাবে :
গত বছরের ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার প্রস্তাবে সংবিধান সংশোধনে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৬৬ বিধি অনুযায়ী ১৫ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। কো-চেয়ারম্যান ও মুখপাত্র করা হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। অন্য সদস্যরা হলেন— আমির হোসেন আমু, মো. আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, অ্যাডভোকেট মো. রহমত আলী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, রাশেদ খান মেনন, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, হাসানুল হক ইনু, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ড. হাছান মাহমুদ ও ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী। কমিটি ২৭টি বৈঠক করা ছাড়াও পাঁচজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, মূল সংবিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণপরিষদ সদস্যসহ দেশের ১৮জন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ২৬জন বুদ্ধিজীবী, ২৬টি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম নেতৃবৃন্দের মতামত নেয়। এছাড়া সার্বিক বিষয়ে অগ্রগতি জানিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা। বিশেষ কমিটিতে যোগ দিয়ে মতামত দেয়ার জন্য বলা হলেও প্রধান বিরোধী দল এতে সাড়া দেয়নি। পরে গত ৮ জুন বিশেষ কমিটি ৫১টি সুপরিশ সংবলিত তাদের প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপন করেন। স্পিকার ওইদিনই ওই প্রতিবেদন আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন। যা ২০ জুনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) সংশোধন-২০১১ প্রস্তাব আকারে অনুমোদিত হয়। ২৫ জুন আইনমন্ত্রী তা বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করলে ২ সপ্তাহের সময় দিয়ে তা সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটি মাত্র ৩ দিনের মধ্যে বিলটি যাচাই-বাছাই করে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীসহ গতকাল সংসদে রিপোর্ট পেশ করে। এর একদিন পরই গতকাল পাস হয় বহুল আলোচিত এই পঞ্চদশ সংশোধনী।

প্রথম সংশোধনী : উত্থাপিত হয় ১২ জুলাই ১৯৭৩। গৃহীত হয় ১৫ জুলাই ১৯৭৩ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ১৭ জুলাই ১৯৭৩। এ সংশোধনী আনীত ও গৃহীত হওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা গণহত্যাজণিত অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতা বিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিল তাদের বিচারের জন্য সরকারকে উপযুক্ত ক্ষমতা প্রদান। এটি পূর্বে সংবিধানে এমনকি প্রচলিত অন্য কোন আইনেও ছিল না। এ লক্ষ্যে সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের সাথে ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ যোগ করা হয় এবং ৪৭(ক) নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয। ৪৭(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে যুদ্ধ অপরাধীদের আইনের আশ্রয়, প্রকাশ্য বিচার সুপ্রীম কোর্টে মামলা দায়ের করার অধিকার প্রভূতি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। উত্থাপনকারী আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর।

দ্বিতীয় সংশোধনী : উত্থাপন করা হয় ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩। গৃহীত হয় ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানো হয়, নিবর্তনমূলক আটক এবং রাষ্ট্রপতিকে যুদ্ধ, বহিরাক্রমন বা দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি স্বাক্ষর নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এবং মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মামলা করার অধিকাও হিত করা হয়। প্রধানত এই সংশোধনী দেশের নাগরিকদের বিনা বিচারে আটকের বিধান, মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ার বিধান এবং সংসদ অধিবেশন ৬০ দিনের বদলে ১২০ দিনের মধ্যে আহ্বান করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। উত্থাপনকারী : আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর।

তৃতীয় সংশোধনী : উত্থাপন করা হয় ২১ নভেম্বর ১৯৭৪। গৃহীত হয় ২৩ নভেম্বর ১৯৭৪ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ২৭ নভেম্বর ১৯৭৪। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৬ মে, ১৯৭৪ এ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত দিল্লী চুক্তির বৈধতা দেয়া হয়েছে। দিল্লী চুক্তির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সীমানা ১৫টি স্থানে রদবদল করতে হয়েছে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে দহগ্রাম আঙ্গুরপোতা ও ভারতকে বেরুবাড়ী হস্তান্তর এবং ২৫ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তির সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান করা হয়। এতে সংবিদানের ২(ক) উপ-অনুচ্ছেদটি সংশোধন করা হয। উত্থাপনকারী : আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর।

চতুর্থ সংশোধনী
উত্থাপন করা হয় ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। গৃহীত হয় ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনও লাভ করে একই দিন অর্থাৎ ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫। এটি দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত সংশোধনী। এর মাধ্যমে ১৯৭২ এর সংবিধানের গণতান্ত্রিক চরিত্র ভূ-লুণ্ঠিত করা হয় এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করা হয। এটি ছিল এদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এক দিনে একটি বিল পাশ হওয়ার ঘটনা। এ সংশোধনীর মাধ্যমে মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের প্রবর্তন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ, একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, রাষ্ট্রপতি ও সংসদের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রভৃতি বিধান সংযোজিত হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আজীবন প্রেসিডেন্ট হয়ে থাকা ও একমাত্র ক্ষমতাসীন দলের অস্তিত্বের বিপরীতে অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণার ব্যবস্থা করা হয। এর দ্বারা রাষ্ট্রপতির ব্যাপক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয। যার মধ্যে মন্ত্রীপরিষদ ও উপরাষ্ট্রপতিকে তার কাছে জবাবদিহি করা, যেকোন সময়ে মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার, যে কোন আদেশ দান ও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা, রাষ্ট্রপতিকে আইনের উর্ধ্বে রাখা, প্রতিরক্ষা বিভাগের সর্বাধিনায়ক করাসহ প্রভূতি বিষয় নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে সংসদ একটি গুরুত্বহীন ও ক্ষমতাহীন বিভাগে পরণত হয়। নাগররিকদের মৌলিক মানবাধিকার সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় স্থানান্তরিত হয় এবং রাষ্ট্রপতিকে এক ব্যাপক ক্ষমতাধর স্বৈরাচারী শাসক হবার সব রকমের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
– চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতির অন্যতম গণতন্ত্র তিরোহিত হয়। উত্থাপনকারী আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর।

পঞ্চম সংশোধনী : উত্থাপন করা হয় ৪ এপ্রিল ১৯৭৯। গৃহীত হয় ৫ এপ্রিল ১৯৭৯, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ৬ এপ্রিল ১৯৭৯। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের পর হতে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত যাবতীয় কর্মকান্ডের ফরম্যান ও প্রবিধানের বৈধতা দান করা হয়। এ সংশোধনীর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিম্নে উল্লেখ করা হল :
১. সংবিধানে প্রারম্ভে প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করা হয।
২. ৪টি মূলনীতির ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ‘সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার অর্থে ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিস্থাপন করা হয়।
৩. সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘মুক্তিসংগ্রাম’ শব্দগুচ্ছের পরিবর্তে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছ সন্নিবেশিত করা হয়।
৪. ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ এর বৈধতা দেয়া হয।
৫. এদেশের জনগণের নাগরিক পরিচয় ‘বাংলাদেশী’ বলে নির্দিষ্ট করা হয। উত্থাপনকারী সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান।

ষষ্ঠ সংশোধনী : ষষ্ঠ সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ১ জুলাই ১৯৮১। গৃহীত হয় ৯ জুলাই ১৯৮১ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ৯ জুলাই ১৯৮১। এ সংশোধনী ছিল উপ-রাষ্ট্রপতি পদ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের বিধান নিশ্চিতকরন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্র-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচনের জন্য এ সংশোধনী আনা হয। সংবিধানের ৫০ ও ৬২(২) অনুচ্ছেদের বিধানমতে রাষ্ট্রের লাভ জনক পদে আসীন কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। সংবিধানের ৬২(২) (ক) ধারা সংযোজন করার মাধ্যমে তা সংশোধন করা হয, যেখানে বলা হয়েছে যে কেউ রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী হওয়ার কারনে প্রজাতন্ত্রের কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলে গণ্য হবেন না। এর মাধ্যমে উপর্রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। উত্থাপনকারী : সংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান।

সপ্তম সংশোধণী : উত্থাপন করা হয় ১০ নভেম্বর ১৯৮৬। গৃহীত হয় ১০ নভেম্বর ১৯৮৬। এ সংশোধনী ছিল পঞ্চম সংশোধনীর ধারাবাহিকতা মাত্র। পাঁচ ঘন্টার ব্যবধানে উত্থাপিত ও গৃহীত এই বিলটি একই দিনে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ‘বাষট্টি’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পয়ষট্টি’ শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয় এবং ২৪ মার্চ ১৯৮২ থেকে ১১ নভেম্বর, ১৯৮৬ পর্যন্ত সামরিক সরকারের সকল কর্মকান্ডের বৈধতা দেয়া হয।
উত্থাপনকারী : আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী বিচারপতি একে এম নুরুল ইসলাম।

অষ্টম সংশোধনী : অষ্টম সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ১১ মে, ১৯৮৮, গৃহীত হয় ৭ জুন, ১৯৮৮ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ‘৯ জন ১৯৮৮। এই সংশোধনটি আনয়ন করা হয় তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠা আন্দোলনকে অবদমন বা স্তিমিত করার কৌশল হিসেবে। এর মাধ্যমে সংবিধানের যেসব পরিবর্তন নিয়ে আসা হয় তা হল-
১. ৩০ নং আইনের ধারা বলে ২(ক) অনুচ্ছেদে সংযোজন, যেখানে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।
২. ৩০ নং অনুচ্ছেদের ৩টি উপ অনুচ্ছেদের বিলুপ্তি-যাতে রাষ্ট্র থেকে সাহসিকতা বা একাডেমিক বিষয় ছাড়া কোনরূপ খেতাব, ভূষন, সম্মান, পুরস্কার বা ভূষন দেয়ার বিষয়টি নিষিদ্ধ ছিল, এই পরিবর্তনের ফলে তা আর নিষিদ্ধ রইল না। এছাড়া প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ব্যতীত বিদেশী রাষ্ট্র থেকে অনুরূপ খেতাব গ্রহণ করা বৈধ ছিল না। এই সংশোধনী সেই বাধা দূর করেছে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। সংবিধানে ১০০ নং অনুচ্ছেদে প্রতিস্থাপন করে বলা হয় যে রংপুর, যশোর, কুমিল্লা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে। প্রধান বিচারপতি প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারককে মনোনয়ন দিয়ে প্রতিটি বেঞ্চে পাঠাবেন। উল্লেখ্য যে, শেষোক্ত পরিবর্তনটি ১৯৮৯ সালের ২ সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশ বলে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এছাড়া এ সংশোধনীতেই রাজধানীর ও ভাষার বানানে পরিবর্তন এনে উধপপধ কে উযধশধ এবং ইবহমধষর কে ইধহমষধ করা হয়। উত্থাপনকারী : সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

নবম সংশোধণী : উত্থাপন করা হয় ৬ জুলাই ১৯৮৯, গৃহীত হয় ১০ জুলাই ১৯৮৯ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ১১ জুলাই, ১৯৮৯। এ সংশোধনীর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এক ব্যক্তির দুই বারের অধিক প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রেসিডেন্সিয়াল নিয়ম-কানুন জারি করা হযছৈ। অবশ্য দ্বাদশ সংশোধনীর পর এ সংশোধনীর কার্যকারিতা আর নেই। উত্থাপনকারী : সংসদ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।

দশম সংশোধনী : দশম সংশোধনী গৃহীত হয় ১২ জুন, ১৯৯০ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ২৩ জুন, ১৯৯০। উত্থাপনকারী আইন ও বিচারমন্ত্রী হাবিবুল ইসলাম। এ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৩০ টি মহিলা আসনকে আরও ১০ বছরের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। এ ব্যবস্থা ছিল অনিবার্য অনুসঙ্গ কারণ সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত খুটিনাটি এতে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া সংবিধানের ইংরেজী ও বাংলা ভাষ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত যে অসঙ্গতি ছিল তা দূর করা হয়।

একাদশ সংশোধনী : একাদশ সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ২ জুলাই, ১৯৯১। গৃহীত হয় ৬ আগস্ট, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ১০ আগস্ট, ১৯৯১। উত্থাপনকারী; আইন ও বিচারমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ।
একাদশ সংশোধনীটিও সাংবিধানিক সংকট উত্তরনের লক্ষ্যে সম্পাদিত হয়। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ফলে তৎকালীন সরকার প্রধান এইচ এম এরশাদ পদত্যাগ করলে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেন। কিন্তু সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রের লাভজনক পদে থেকে কেউ রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। তিন জোটের সমর্থনের কারনে তিনি সেখানে থেকে নির্বাচন পরিচালনা করেন, ফলে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে তার পূর্বপদে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচালিত সকল কর্মকান্ডের বৈধতা প্রদান কর হয়।

দ্বাদশ সংশোধনী : দ্বাদশ সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ২ জুলাই, ১৯৯১। গৃহীত বা সংসদে পাশ হয় ৬ আগস্ট, ১৯৯১। উত্থাপনকারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য ছিল তিন জোটের ঘোষনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন। ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১ সালে গৃহীত গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন লাভের পরে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ সালে এই সংশোধনী প্রস্তাবটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং সংবিধানের ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন ও সংশোধনী আনয়ন করা হয়। এই সংশোধনের ফলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হ্রাস করে বলা হয়, তিনি সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন এবং স্বাধীনভাবে তিনি দুটি কাজ করতে পারবেন। আর তা হল-
১. অধিকাংশ সংসদ সদস্যগণের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ।
২. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এর মাধ্যমে উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত হয়, সকল নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীসভার হাতে ন্যাস্ত হয়। সংসদের দুটি অধিবেশনের মধ্যকার বিরতি ৬০ দিন নির্ধারণ করা হয।


ত্রয়োদশ সংশোধনী : ত্রয়োদশ সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ২১ মার্চ ১৯৯৬ গৃহীত তথা সংসদে পাশ হয় ২৭ মার্চ, ১৯৯৬ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ২৮ মার্চ, ১৯৯৬। উত্থাপনকারী : শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।
এ সংশোধনীর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সকল জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করা হয়। এই সরকার সংসদ ভেঙ্গে দেবার পর দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং নির্বাচনের পর প্রধামন্ত্রীর ক্ষমতা গ্রহনের সঙ্গে সঙ্গে এর মেয়াদ শেষ হবে। সংশোধনীর ফলে সংবিধানে আনীত এ বিষয়গুলো ব্যাপক এবং বিস্তারিত। এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান, তার যোগ্যতা, দায়িত্ব, পদত্যাগ বা ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে শুরু করে সরকারের সহযোগিতার জন্য ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ, তাদের যোগ্যতা, কর্তব্য, শপথ গ্রহণ পদত্যাগ প্রভূতি বিষয়গুলো বর্ণিত হয়েছে।

চতুর্দশ সংশোধণী : প্রথম উত্থাপন করা হয় ১৭ মার্চ ২০০৪ ; পুনরায় উত্থাপন করা ২৮ এপ্রিল, ২০০৪; সংসদে পাশ হয় ১৬ মে, ২০০৪ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয় ১৭ মে, ২০০৪। ২২৬-১ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। উত্থাপনকারী আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিশেষত সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ পূরনের লক্ষ্যে অর্থাৎ জাতীয় সংসদে মহিলা আসন সংরক্ষনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই সংশোধনী আনীত হলেও একই সাথে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী সংযোজিত হয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s